সলিমুল্লাহ খান
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কি বুঝায় তাহা লইয়া সম্প্রতি একটি সূক্ষ্ম বিতর্কের সূচনা হইয়াছে। কিন্তু কয়েকটি মোটা কথা লইয়া আশা করি কেহ বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইবেন না। ইহাদের মধ্যে প্রধান কথা খোদ ‘স্বাধীনতা’ অথবা যে কোন জাতির বা জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইনানুগ অধিকার।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশ কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইহার দুই সপ্তাহ পরে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার। ইহাতেই প্রমাণ বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য অন্তত সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল না। মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত এই সরকার ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রকে প্রামাণ্য দলিল বলিয়া গণ্য করিলে কয়েকটি বিষয়ে বিতর্কের সমাপ্তি হয়। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্র জারি হইয়াছিল ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সালের ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে। এই প্রতিনিধিগণ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হইয়াছিলেন।
১
১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ কি কারণে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তাহার একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। সেই ব্যাখ্যা অনুসারে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বতস্ফূর্তভাবে কিম্বা আগ বাড়াইয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নাই। স্বাধীনতা ঘোষণা করিতে তাহাদিগকে বাধ্য করা হইয়াছিল। কারণ ‘পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে।’
খোদ ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রেই উল্লেখ করা হইয়াছিল ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখ-তা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান’। দুঃখের মধ্যে, স্বাধীনতার ঘোষণা লইয়া কেহ কেহ পরকালে একপ্রস্ত বিতর্কের সূচনা করিয়াছিলেন। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রের প্রামাণ্যতা কি কেহ আজ পর্যন্ত অস্বীকার করিয়াছেন? না করিলে জিজ্ঞাসা করিতে হয় এই ঘোষণাপত্রের কোন বক্তব্যটিকে তাহারা অস্বীকার করিতেছেন?
প্রশ্ন উঠিবে ২৬শে মার্চ তারিখে কেন স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা হইয়াছিল। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে তাহার একটা উত্তরও পাওয়া যাইতেছে। ঘোষণাপত্র অনুসারে এই উত্তরটি পাঁচ দফায় পাওয়া যায়।
এক নম্বরে, [পাকিস্তানের] একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানায়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দুই নম্বর কথা, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জনকে নির্বাচিত করেন।
তিন নম্বর কথা, সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে [পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি] জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে মিলিত হইবার জন্য আহবান করেন।
চার নম্বরে, [পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ] এই আহুত পরিষদ-সভা স্বেচ্ছাচারী ও বে-আইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন।
আর পরিশেষে, পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
এই পর্যন্ত যাহা বলা হইল–অর্থাৎ পাকিস্তান কর্তৃক অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধ চাপাইয়া দেওয়া–তাহাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রকৃত আর পর্যাপ্ত কারণ। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছিল আরো একটি বাড়তি কারণ। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ শুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা করিয়াই বসিয়া থাকে নাই। ২৫শে মার্চ মধ্যরাত্রি হইতে তাহারা ‘বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের উপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসংখ্য অপরাধ সংঘটন’ করে।
পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়াছিল আর গণহত্যার মতন অপরাধ ও অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপ করিয়াছিল বলিয়াই বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছিল আর বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করিয়াছিলেন। এই ঘোষণাপত্রের মধ্যস্থতায় তাঁহারা একটি ন্যায়যুদ্ধের আইনানুগ ভিত্তি রচনা করিয়াছিলেন। পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে তাই বলিতে হইবে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের চাপাইয়া দেওয়া অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও দমনপীড়নের জওয়াবে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের ভূখ-ের উপর আপনার কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। এই যুদ্ধে জনগণের মূলধন ছিল তাহাদের ‘বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনা’।
২
এই পর্যন্ত যাহা বলা হইল–অর্থাৎ অন্যায় যুদ্ধের মুখে ন্যায়যুদ্ধ–তাহা সত্যের অর্ধেক মাত্র। প্রশ্ন উঠিবে ন্যায়যুদ্ধের মধ্যস্থতায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাইবে তাহার লক্ষ্য কি হইবে। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে তাহারও একটি জওয়াব পাওয়া যায়। এই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করিয়াছিল সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সামান্য কারণ, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত’ করা।
বাংলাদেশের ভূখ-ে কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনগণ সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের শর্তহীন আত্মসমর্পণের ঘটনায় সেই কর্তৃত্বই নিরঙ্কুশ হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিজয় লাভ করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর জনগণ যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হইয়াছিলÑযাহার প্রকাশ ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে পাওয়া যায়Ñতাহাই তো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’।
জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার অর্থাৎ স্বাধীনতা পাওয়ার ৪২/৪৩ বৎসরে আমাদেরও খতিয়ান খুলিয়া দেখিতে হইবে আমরা কি পাইলাম। স্বাধীনতা লাভের চারি বৎসরও পার হইতে না হইতে দেশে কেন সামরিক শাসন নামিয়া আসিয়াছিল? এই জিজ্ঞাসা আমাদের করিতেই হইবে। সেই চারি বৎসরে যাহারা ছিলেন জাতির মনোনীত গণপরিষদ বা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্য তাহারা কেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ‘বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনা’র মধ্যস্থতায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে পারিলেন না? ইহাও জিজ্ঞাসার বিষয়।
ইহার পর হরেদরে পনের বৎসর কাটিয়াছে এক ধরনের না আর ধরনের সামরিক শাসনে। ১৯৯০ সনের পর হইতে–মধ্যখানের দুই বছরের কথা ছাড়িয়া বলিতেছি–আবার নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হইয়াছে। কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্টের কি নিবারণ হইয়াছে? ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচার’ কি প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে? যদি না পাইয়া থাকে, তবে তাহার জন্য দায়ী কে? চুপ করিয়া থাকা নহে, এই সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
পাকিস্তান ‘স্বাধীন’ হইয়াছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট তারিখে। ইহার দশ বৎসরের মাথায়Ñ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর নাগাদÑসেই দেশে পহিলা সামরিক শাসন প্রবর্তিত হয়। ১৯৬৪ সালের শেষদিকে এই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়া অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখিয়াছিলেন, ‘স্বাধীনতার ফলে আমরা কি পেলাম? আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য মিত্র শক্তির নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি যে, তাঁদের আর্থিক ও অন্য সাহায্যে আমরা কিছুটা অগ্রসর হয়েছি। আমরা যে পূর্ণ সাফল্য লাভ করতে পারিনি, তার একটি বড় কারণ ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবরের সামরিক শাসন প্রবর্ত্তনের পূর্বে যাঁরা শাসনকার্যে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা ছিলেন ইংরেজের গোলাম। স্বাধীনতার পরেও তাঁরা সেই গোলামীর মনোবৃত্তি ষোল আনা ছাড়তে পারেননি।’ ইহার সহিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরো একটি বাক্য যোগ করেন: ‘তারপর যাঁরা ছিলেন জাতির মনোনীত রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, তাঁদের সম্মানিত কয়েকজনকে বাদ দিয়ে বলতে হয় অধিকাংশের মূলমন্ত্র ছিল Nepotism এবং Pocketism। বাংলায় বলতে গেলে “আত্মীয় প্রতিপালন এবং পকেট পরিপূরণ”।’
এইসব দুর্নীতির কারণেই পাকিস্তানে সামরিক শাসনের প্রয়োজন হয় বলিয়া শহীদুল্লাহ সাহেব অনুমান করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনিও জানিতেন মাত্র শাসনকর্তার পরিবর্তনে দেশের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। পাকিস্তানের সামরিক শাসন সে দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করে নাই। শহীদুল্লাহ সাহেবের মতে, ইহার প্রধান কারণ জনসাধারণের অজ্ঞতা। তাঁহার কথামৃত সামান্য আরেকটু উদ্ধার করিলে মন্দ হইবে না: ‘অন্ধের পক্ষে দিন-রাত দুইই সমান। মূর্খের পক্ষে আযাদী ও গোলামী দুই সমান। যেখানে প্রকৃত প্রস্তাবে শতকরা ৪/৫ জন শিক্ষিত সেখানে আমরা কি আশা করতে পারি? মূর্খ ও নাবালক দুইই সমান। নাবালককে ফাঁকি দিয়ে তার আত্মীয়-স্বজনেরা নিজেদের জেব ভর্তি করে। এদেশে তাই ঘটেছে।’
বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে আজ ৪৩ বছর হইল। বাংলাদেশেরও অনেক গতি হইয়াছে। কিন্তু সমাজের ভিত্তি যে জনগণÑবাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী যে জনগণÑতাহাদের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হইয়াছে? আমাদের দেশে এই ৪৩ বছরেও–অন্য কথা না হয় বলিলাম না, বলেন দেখি–প্রকৃত প্রস্তাবে শতকরা কতজন শিক্ষিত হইয়াছেন?
৩
আমরা নিত্য বলিয়া থাকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হইয়াছেন। কিন্তু আমরা তাঁহাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এই ৪৩ বছরের মধ্যে তৈয়ার করিতে পারি নাই। তাহা হইলে কি করিয়া আমরা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ নিশ্চিত করিব? ইংরেজি ২০০০ সনের ১২ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মহান লেখক আহমদ ছফা এই প্রশ্নটি তুলিয়াছিলেন। আমি আজও প্রশ্নটির কোন সদুত্তর পাই নাই। তাই প্রশ্নটির একটু সবিস্তার বয়ান করিতে হইতেছে।
আহমদ ছফার জন্ম চট্টগ্রাম (দক্ষিণ) জেলার অন্তপাতী পটিয়া উপজেলায়। তাঁহার গ্রামের নাম গাছবাড়িয়া। এখন তাহা সম্প্রতি গঠিত চন্দনাইশ উপজেলায় পড়িয়াছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ ছাড়িয়া আগরতলা হইয়া কলিকাতায় আশ্রয় লইয়াছিলেন। যুদ্ধশেষে তিনি প্রথমে ঢাকায় আসেন, পরে নিজ গ্রামে গেলেন। ইহার পরের কথা তাঁহার লেখায় পাওয়া যাইতেছে: ‘১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে যতবারই আমি গ্রামে গেছি, গ্রামের মানুষদের একটি বিষয়ে রাজি করাতে বারবার চেষ্টা করেছি। গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং মাতব্বর-স্থানীয় মানুষদের একটা বিষয়ে রাজি করাতে বারবার চেষ্টা করেছি। আমি তাঁদের বোঝাতে চেষ্টা করেছিলামÑআমাদের গ্রামের প্রায় একশ মানুষ পাকিস্তানী সৈন্য এবং রাজাকার আলবদরদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। আমাদের গ্রামের মাঝ দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রাস্তাটি চলে গেছে। আমি প্রস্তাব করেছিলাম, গ্রামের প্রবেশমুখে মুক্তিযুদ্ধে নিহত এই শতখানেক মানুষের নাম একটি বিলবোর্ডে লিখে স্থায়ীভাবে রাস্তার পাশে পুঁতে রাখার জন্য।’
আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন: ‘আরো একটা বাক্য লেখার প্রস্তাব আমি করেছিলাম। সেটা ছিল এরকম–হে পথিক, তুমি যে গ্রামের ওপর দিয়ে যাচ্ছ সে গ্রামের একজন সন্তান দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমি আমার এই প্রস্তাবটি ১৯৭২ সাল থেকে করে আসছি। প্রথম প্রথম মানুষ আমার কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করত। তিনচার বছর অতীত হওয়ার পরও যখন প্রস্তাবটা নতুন করে মনে করিয়ে দিতাম লোকে ভাবত আমি তাদের অযথা বিব্রত করতে চাইছি। আমার ধারণা, বর্তমান সময়ে যদি আমি প্রস্তাবটা করি লোকে মনে করবে আমার মাথাটা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে।’
তাহা হইলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কি বুঝাইতেছে? শুদ্ধ আহমদ ছফার নিজ গ্রামে কেন, সারাদেশেই তো একই অবস্থা। তিনি লিখিতেছেন: ‘উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ এবং মধ্যবঙ্গের প্রায় আট-দশটি জেলায় আমাকে কার্যোপদেশে এন্তার ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। আমি যেখানেই গিয়েছি লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন ঘটনা ঘটেছিল কিনা। অনেক গ্রামের লোক আমাকে জানিয়েছে, ‘আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবিরা একেবারেই আসেনি’। অনেক গ্রামের লোক জানিয়েছে পাঞ্জাবিরা এসেছিল, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে এবং অনেক খুনখারাবি করেছে। আমি জিজ্ঞেস করতাম যে সব মানুষ মারা গেছে তাদের নাম-পরিচয় আপনারা জানেন কিনা। গ্রামের লোক উৎসাহ সহকারে জবাব দিতেন–জানব না কেন! অমুকের ছেলে, অমুকের নাতি, অমুকের ভাই ইত্যাদি ইত্যাদি।’
তবুও কেন মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের একটা পূর্ণ তালিকা কেহ প্রণয়ন করিলেন না! আহমদ ছফা আক্ষেপ করিতেছেন, ‘আমি তখন বলতাম, মুক্তিযুদ্ধে নিহত এই মানুষদের নাম আপনারা রাস্তার পাশে লিখে রাখেন না কেন! কোন লোক যখন আপনাদের গ্রামের ওপর দিয়ে যাবে এবং নামগুলো পড়বে [তখন সেই] পথিকের মনে আপনাদের গ্রাম সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেবে। গ্রামের লোকেরা আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকত। যেন আমি কি বলছি সেটার মর্মগ্রহণ করতে একেবারে অক্ষম।’
এই জায়গায় আসিয়া আমাদের মহান লেখক দেখাইতেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কি সুদূর অবস্থা হইয়াছে! আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের যে সমস্ত অঞ্চলে আমি গিয়েছি কোথায়ও দেখিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নাম যতœ এবং সম্মানের সঙ্গে লিখে রাখা হয়েছে। এ ধরনের একটি কাজ করার জন্য আহামরি কোন উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল না। দেশের প্রতি এটুকু ভালবাসা এবং মুক্তিযুদ্ধের কারণে নিহত মানুষদের প্রতি এটুকু শ্রদ্ধাবোধই যথেষ্ট ছিল।’ ইহার প্রতিকার আজও কি সম্ভব নহে? সম্ভব না হইলে বলিতে হইবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নাই।
সূত্র: সর্বজন, ১০ মার্চ ২০১৪
দোহাই
১. অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘স্বাধীনতা’, দৈনিক পয়গাম, বিপ্লব সংখ্যা, ২৬ অক্টোবর ১৯৬৪, ৯ কার্তিক ১৩৭১।
২. আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় জন্মায়?’ খবরের কাগজ, ১৯ বর্ষ, ৫০ সংখ্যা, ১২ ডিসেম্বর ২০০০, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪০৭।
৩. ‘১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’, সপ্তম তফসিল [১৫০ (২) অনুচ্ছেদ], গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, পুনর্মুদ্রণ, অক্টোবর ২০১১।