আগের সরকার প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, সেটার ছাপ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে বেশি পড়েছে, নাকি শিক্ষায়?
অর্থখাতের আলাপ বাদ রাখলাম। মনে রাখবেন, টাকা গেলে টাকা আসে। রফতানি আয়, প্রবাসী আয় এগুলো থেকে যত কষ্টই হোক, আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। খাদ্যেও আমরা একটু পরিকল্পিত হলেই ঠিক করে ফেলতে পারবো। কঠোর হাতে ব্যাঙ্ক খাত ঠিক করা হয়তো এক বছরের মামলা। এখনই বেশ অনেকটা আস্থা ফিরে এসেছে অর্থনীতিতে। দ্রব্যমূল্য এখনও কমেনি, কিন্তু মানুষ ভরসা পাচ্ছেন। দুর্নীতিবাজদের বিচার হলে এবং যোগ্য লোকগুলো ব্যাঙ্কের দায়িত্ব পেলে এই খাত দ্রুতই অনেকটা ঠিক হয়ে যাবে। কাজটা সহজ না, কিন্তু অসম্ভবও না।
কিন্তু পুলিশ বাহিনী বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক বেশি। প্রশ্ন হলো, কোনটাতে কী পরিস্থিতি?
গত সরকারের ভিত্তি ছিলো পুলিশ। মনে আছে, একবার প্রথম আলোতে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর একটা শিরোনাম এসেছিলো: মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ!
আওয়ামী লীগ যে আর নির্বাচনের ধার ধারবে না তার লক্ষণ ফুটে উঠেছিলো বিএনপির তৎকালীন জাতীয় সংসদের হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুকের ওপর হারুনের বীভৎস হামলার দৃশ্যে। পুরস্কার হিসেবে হারুন পদোন্নতি পায়, অচিরেই হারুনের ভাতের হোটেল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।
এই পুলিশ রাতারাতি আপনি ঠিকঠাক করতে পারবেন না। এখনও রাতের বেলা পুলিশ কাজে যেতে চায় না, কারণ অজস্র মানুষকে তারা নির্যাতন করেছে। মানুষের সেই ক্ষোভকে সঙ্গতকারণেই তারা ভয় পায়।
পুলিশ পুনর্গঠন একটা অত্যন্ত জরুরি কাজ। কঠিন কাজও।
কিন্তু কেন যেন আমার মনে হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আওয়ামীকরণের ফল জাতির জন্য একই রকম সহিংস ও ভয়াবহ ছিলো।
পুলিশ থাকে থানায়। কিন্তু একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকে আপনার পাড়ার মাঝে। সেখানে দলীয়করণ, নোংরামি এবং দখলদারিত্ব, দুর্নীতি মানুষকে প্রাত্যহিক দেখতে হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রায় পূজার আয়োজন করা হয়েছে এবং ক্ষমতাধর লোকদের মচ্ছব চলেছে।
আর এক একটা গণরুমে শত শত মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। বন্দি জীবনের এই স্মৃতি, শিশুর শিক্ষা জীবনের ওপরও ওই দখলদারিত্ব, এগুলো গণমানুষের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পুলিশকে এক সপ্তাহ পর মানুষ আর মারতে যায়নি। কিন্তু তার পাড়ার মাঝের বিদ্যালয়, কিংবা যেখানে সে বন্দির জীবন যাপন করেছে, সেই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে তার ক্ষোভ ঝাড়া এখনো শেষ হয়নি।
এই ক্ষোভ ঝাড়ার কায়দাটা বহুক্ষেত্রেই প্রত্যাঘাতের মতই এসেছে। বহু ক্ষেত্রে পালটা দখল এবং পাল্টা অন্যায় হয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রতিষ্ঠিত হতে হয়, এগুলোকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। এটা নিয়ে সকলেই একমত।
দমনের দুটো উপায় আছে, একটা হলো জনমত। আরেকটা হলো পুলিশ।
পুলিশ অকার্যকর, এখনও।
সুস্থ যে কোন রাষ্ট্রের শিক্ষামন্ত্রীর প্রধান কাজ থাকে শিক্ষার মান উন্নয়ন ও তাকে যুযোগপযোগী করার যাবতীয় আয়োজন।
বাংলাদেশের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে শিক্ষাকে গড়ে তোলার সাথে সাথে তাকে প্রায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করতে হবে কিছুদিন।
বলা যায়, হারকিউলিস রাজা এজিয়াসের মত আস্তাবল সাফ করার মত কঠিন একটা কাজ করছেন তিনি। ওই গোয়াল পরিস্কার করতে হারকিউলিস নদীর স্রোত ব্যবহার করেছিলেন।
জনমত, জনজোয়ার এবং আস্থা হয়তো সেই স্রোতের ভূমিকা পালন করতে পারে, উপদেষ্টা মণ্ডলি যৌথভাবে হয়তো সেই কাজটা করতে পারবেন, আস্থার জায়গাটাকে আরও শক্তভাবে তৈরি করা।
এক রাজার পতনের পর নতুন শাসন স্থিতিশীল হবার আগ পর্যন্ত সময় ইতিহাসে সর্বদা বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়। বাংলাদেশের এই একটা অদ্ভুদ অসাধারণ দিক, পুলিশের যা পরিস্থিতি, তাতে প্রতিদিন ভয়াবহ নারকীয় কিছু হবার কথা ছিলো। এই জন্যই এর নাম অরাজক।
এই অরাজক পরিস্থিতিতে কিছু কারখানা ধ্বংস হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দখল দারিত্ব আর শিক্ষকদের ওপর বহু হামলা হয়েছে। এগুলোর প্রভাব শিল্পখাতে, অর্থনীতিতে বা শিক্ষাখাতে পরলেও এগুলো প্রধানত ছিলো আইন শৃঙ্খলার প্রসঙ্গ। এবং তার জন্য প্রধানত দায়ী পতিত সরকারের ভূমিকা।
বাংলাদেশের মানুষ ভালোবাসা নিয়ে এবং গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে এই সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে, আমরাও তাদের মাঝেই আছি।এক মাস তাদের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। কিন্তু আস্থার যে পরিবেশ তারা তৈরি করতে পেরছেন অত বড় ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে, সেটা এই এক মাসের বড় অর্জন।