ক্ষমা নিয়া জাক দেরিদার আলাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল ব্যবহারিক ক্ষমা/ক্ষমতা থেকে বিশুদ্ধ ক্ষমাকে আলাদা করা।
দুনিয়ায় বেশিরভাগ সময় আমরা ব্যবহারিক ক্ষমাই দেখি। সাধারণ ক্ষমা বা এমনেস্টি, রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ড মার্জনা, ইত্যাদি ব্যবহারিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করা ক্ষমাই হল ব্যবহারিক ক্ষমা।
মহানবী মক্কা বিজয়ের পর ক্ষমার (আমান/নিরাপত্তা) ঘোষণা দেন। এই নিরাপত্তাপ্রাপ্তদের একজন আবু সুফিয়ান, যাঁর থেকে উমাইয়া বংশের বিকাশ।
১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান “যেসব ব্যক্তি ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ অথবা পরিকল্পিত হত্যার দায়ে অভিযুক্ত অথবা দণ্ডপ্রাপ্ত; তারা ব্যতীত বাংলাদেশে দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) ১৯৭২ বলে অভিযুক্ত অথবা সাজাপ্রাপ্ত”দের সাধারণ ক্ষমা করেন।
রাজনীতির ইতিহাসে ব্যবহারিক ক্ষমার নজির সুপ্রচুর।
মোগল বাদশাদের কথাই চিন্তা করেন। একসময় মনে করা হতো মোগল বাদশাদের ছিল একচ্ছত্র ও সর্বময় ক্ষমতা। বাঘেগোরুতে এক ঘাটে জল খাওয়াতেন ওনারা লাহোর থেকে চট্টগ্রাম। কিন্তু আজকাল ইতিহাসবিদেরা বলেন মোগলদের ক্ষমতা ছিল সীমাবদ্ধ। যা ইচ্ছা তাই করত না তারা, বরং আপস-সমঝোতা করে তারা শাসন পরিচালনা করত। এমনকি মোগল সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত যারা, তাদেরকে প্রায়ই মোগলরা ক্ষমা করে দিত। ক্ষমা করে আবার যার যার এলাকায় রাজত্বও চালাতে দিত। ইনস্টিটিউশনাল ইকোনমিস্টরা বলেন মোগলরা ক্ষমা করত কারণ সব অবাধ্য লোকাল রাজা-জমিদারকে সরিয়ে সাচ্চা অনুগত লোক বসানোর চেয়ে বরং বিদ্রোহীদের সাময়িক শায়েস্তা করে তারপর ক্ষমা করে দেওয়াই মোগলদের জন্য সুবিধাজনক ছিল।
মোগলেরা এই ক্ষমা করার ক্ষেত্রে কিছু আচার-অনুষ্ঠান করত। খিলাত বিতরণ ধরনের বায়াতি অনুষ্ঠান। যে ছিল বিদ্রোহী, তাকে বায়াত দিয়ে অনুগত বানানোর কাজ। আমাদের দেশে আজও কথায় আছে, “পড়েছ মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে”। অর্থাৎ মোগলের কবলে পড়লে খেয়েদেয়ে বায়াত না নিয়ে যাবে কোথায়!
তাইলে ক্ষমা নিয়ে বলার কথা দুইটা। প্রথমত, একমাত্র ক্ষমতাই ক্ষমার আমল করতে পারে। যার ক্ষমতা নাই তার ক্ষমা করা না করায় ব্যবহারিক জগতের কিছু এসে যায় না।
ক্ষত, ক্ষতি, ক্ষমা ও ক্ষমতা একই রুটের শব্দ। যে ক্ষতিগ্রস্ত বা ক্ষতগ্রস্ত, তার ক্ষমতা থাকলেই তার ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত ব্যবহারিক জগতে গুরুত্ব লাভ করে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাধর প্রায়ই ব্যবহারিক বিবেচনা থেকে ক্ষমা করা বা না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
যেকোন ক্ষমতাই টিকে থাকার প্রয়োজনে এবং ক্ষমতাপ্রয়োগের প্রয়োজনে ক্ষমা করে। ক্ষমা করা ছাড়া ক্ষমতা ক্রিয়া করতে পারে না। সমাজের সবার উপর নিরংকুশ আধিপত্য এবং দণ্ডপ্রয়োগ অসম্ভব। ক্ষমতা মুখেমুখে নিরংকুশ ও ক্ষমাহীন দণ্ডবাদের দাবি করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা আমল করা অসম্ভব। ফলে যেকোন ক্ষমতার স্ট্র্যাটেজির অংশই হল নানাধরনের ব্যবহারিক ক্ষমা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মান ইতিহাস কিংবা ইরাক যুদ্ধের পর বাথ পার্টিকে খারিজ করার প্রচেষ্টা, কিংবা নিকট অতীতে আওয়ামী ক্ষমতার দ্বারা সমাজের নানা উপাদানকে নির্মূল করার চেষ্টার উদাহরণ থেকেও বোঝা যায় ক্ষমার ব্যবহারিক প্রয়োগ মূলত ক্ষমতার স্ট্র্যাটেজির জন্য অপরিহার্য। হারুন সাহেবের ভাতের হোটেল যে একটা বায়াতি রিচুয়াল আকারে কাজ করত, সেটা এই ব্যবহারিকতার চটুল উদাহরণ।
আওয়ামী লীগের পতনের অনেক আগ থেকেই অনেকে “ডিআওয়ামীফিকেশনে”র কথা বলে এসেছেন। আওয়ামী লীগের পতনের পরে ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়কেরা “আপাতত সবাইকে সাধারণ ক্ষমা” করার ঘোষণা দেন। ক্ষমতার আঁচ পাওয়া জামাতের আমির ২৮ আগস্ট বলেছেন আমরা ফৌজদারি অপরাধী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস মামলায় খালাস পেয়ে বলেছেন, “আমি মহৎ ব্যক্তি না, জীবনের বিনিময়ে কাউকে ক্ষমা করতে পারব না। এই বিচার আমি আল্লাহর কাছে চাই।” এগুলোকে আমরা বলতে পারি ক্ষমা বিষয়ক ম্যাক্রো আলাপ।
কিন্তু একইসঙ্গে সমাজের ভেতর নানা দর-কষাকষি চলছে। অনেকে টাকা দিয়ে, মাশুল দিয়ে, রাজনৈতিক সেলামি দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা (আমান, অনানুষ্ঠানিক এমনেস্টি) কিনছেন। ৫ আগস্টের পর গণহারে দায়ের করা নানা মামলার ফলেও অনেকে নানা ঘাটে মাশুল দিয়ে নিজেদের ক্ষমা, নিরাপত্তা, আমান কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থাৎ সমাজে একধরনের ব্যবহারিক ক্ষমার মাইক্রোপলিটিক্স “চালাই দেওয়া” হচ্ছে যা টাকা, দলবদল, ক্ষমতার দর-কষাকষি সহ নানা স্বার্থগত বিবেচনা দিয়ে কেনাবেচা করা যায়।
কোন রাজনৈতিক প্রকল্প যতই ইউটোপীয় ও বিশুদ্ধতাবাদী হোক, তা যখন বাস্তবতার মাঠে নিজেকে ক্ষমতা আকারে সংগঠন করে, তখন এইধরনের ব্যবহারিক বিবেচনাগুলো প্রবল হয়ে ওঠে বৃহৎ ও আণবিক নানা পর্যায়ে।
কিন্তু দেরিদা সহ ক্ষমাতাত্ত্বিকদের আলাপের জের টেনে মূল যে প্রশ্ন তোলা যায়, ক্ষমতাই যদি ক্ষমা করার অধিকারী, তাইলে ক্ষমতাহীন যে মজলুম, তার পরিবর্তে কি ক্ষমতা সিদ্ধান্ত নিতে পারে ক্ষমা করে দেওয়ার বা ক্ষমা না করার? যার ক্ষতি বা ক্ষত, তাকে উপেক্ষা করেই কি স্রেফ ব্যবহারিক বিবেচনায় ক্ষমা করা বা না করা যায়? এখানে জাস্ট ডেজার্ট ধরনের শোধবাদী দণ্ডতত্ত্বের প্রসঙ্গ আসবে। সেদিকে না যাই। ট্রুথ এন্ড একাউন্টেবিলিটি, রিকনসিলিয়েশন ইত্যাদির আলাপ ২০১৩ সালে বা অন্য নানা সময়ও উঠেছিল। কিন্তু আলাপটা চাপা পড়ে গিয়েছিল।
বলাবাহুল্য, একাত্তরের ক্ষত কারো কাছে ক্ষমতার রাজনীতি এবং কারো কাছে ক্ষমতা হারানোর রাজনীতি আকারে হাজির হয়েছিল বলে সেই ব্যবহারিক হিসাবনিকাশ ক্ষত ও ক্ষমা প্রসঙ্গকে আবিল করে তুলেছিল৷ সামনের দিনেও রাজনৈতিক ক্ষমতার সংগঠনের প্রশ্নই ক্ষত ও ক্ষমার আলাপগুলোর উপর নানাভাবে আছর করবে।
“বিশুদ্ধ ক্ষমা” কিংবা বেজবান মজলুমের ক্ষমা ও ক্ষমাহীনতার প্রশ্ন নিরুচ্চার রয়ে যাবে।ক্ষমা কিংবা ক্ষমাহীনতার সঙ্গে ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীনতার যে ধাতগত ব্যবহারিক সম্পর্ক, তাকে বিবেচনায় না নিলে ক্ষমার প্রশ্নকে বোঝা অসম্ভব।